আমাদের সংসার
#লেখকঃ- Tamim
#পর্বঃ- ২
,,
,,
তামিম গভীর রাত পর্যন্ত মায়ার ব্যবহারে এমন পরিবর্তন আসা নিয়ে অনেক ভেবেছে। কিন্তু তামিম কিছুতেই বুঝতে পারল না যে মায়া হঠাৎ কেন এমন করছে। এতো মাস ধরে তো মায়া ভালোই ছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ মায়ার কি এমন হলো? এইসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তামিমের চোখের পাতা ভারি হয়ে আসলো। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখে ঘুমের জোয়ার চলে আসলো। তামিম আর এইসব নিয়ে না ভেবে ঘুমিয়ে পরল, কারণ সকালে আবার অফিসেও যেতে হবে।
.
জানালার পর্দা ভেদ করে সকালের মিটিমিটি সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করে তামিমের চোখের উপর পরতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে জেগে তামিম একটু হাই তুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ৮ঃ৫০ বেজে গেছে। আজ এতো বেলা অবধি ঘুমিয়ে থাকায় তামিম নিজেই কিছুটা অবাক হলো। কারণ অন্যদিন ৮ টা হলেই মায়া তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিত। অবশ্য আজ এতো বেলা করে ওঠার একটা কারণও আছে। বেশি রাত জাগাতে আজ দেরি করে ঘুম ভেঙেছে। তামিম একবার তার ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। তামিম এতেও কিছুটা অবাক হলো। কারণ তাদের বিয়ে হওয়ার পর থেকে মায়া কোনোদিন এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকেনি। প্রতিদিন মায়া তামিমের আগে ঘুম থেকে উঠেছে আর তাদের জন্য নাস্তা বানিয়ে তামিমকেও ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছে। নাস্তার কথা মনে পরতেই তামিম তাড়াতাড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে পরল। অফিস শুরু হয় সাড়ে নয়টায়, আর এদিকে প্রায় নয়টা বেজেই গেছে। তামিম আর সময় নষ্ট না করে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে তামিম সোজা রান্নাঘরে চলে আসলো নাস্তা বানানোর জন্য। রান্নাঘরে এসে ফ্রিজ খুলে ব্রেড আর কয়েকটা ডিম বের করে। তারপর ডিমগুলো ভেঙে সেগুলোর সাথে কয়েক চামচ চিনি মিশিয়ে ভালো করে নেড়েছেড়ে নেয়। এরপর একটা পাতিল চুলায় বসিয়ে সেটায় হালকা তেল ঢেলে দুইটা ব্রেড সেই ডিমগুলোর সাথে ভালো করে মাখিয়ে পাতিলে ছেড়ে দেয়। এইভাবেই বেশ কয়েকটা মামলেট করার পর সেগুলোর অর্ধেক একটা প্লেটে রেখে দিল আর বাকি অর্ধেক একটা টিফিন বক্সে রেখে দিল মায়ার জন্য, যাতে ঠান্ডা না হয়। টিফিন বক্সের পাশে তামিম একটা কাগজে ছোট্ট করে লিখে রাখল, "আমি খেয়ে নিয়েছি, তুমিও খেয়ে নিও।" তামিম প্লেটে রাখা মামলেটগুলো খেয়ে রুমে এসে রেডি হয়ে নিল। রেডি হওয়া শেষে রুম থেকে বেরোনোর আগে একবার মায়াকে একটু কাছ থেকে দেখে নিল। তামিমের ইচ্ছা হচ্ছিল মায়ার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে। কিন্তু গতকালের কথাটা ভেবে তামিম আর সেটা করল না। অফিসের ব্যাগটা কাধে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
.
অফিসে এসে কাজ করতে করতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে আসলো। এইটুকু সময়ের মধ্যে মায়া তামিমকে আজ একটা কল পর্যন্ত দেয়নি। তামিম প্রথমে ভেবেছিল হয়তো লাঞ্চ টাইমের সময় মায়া ফোন করে জিজ্ঞেস করবে সে খেয়েছে কি না। কিন্তু না, লাঞ্চ টাইম শুরু হয়ে বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল কিন্তু মায়ার একটা কলও আসলো না। অথচ বিয়ের পর থেকেই মায়া প্রতিদিন লাঞ্চ টাইমের আগে তামিমকে কল জিজ্ঞেস করত সে খেয়েছে কি না। যদি তামিম বলত না, তাহলে মায়া তাকে খেয়ে নিয়ে বলত। কারণ তামিম না খাওয়া অবধি মায়া কখনো খাবার খায়নি। আর তামিমও ভালো করেই জানে যে, সে না খাওয়া অবধি মায়া কখনো খাবার খাবে না। তামিম এবার মায়ার বিষয়টা নিয়ে গভীর ভাবনায় পরে যায়। আর নিজেই নিজের সাথে কথা বলতে শুরু করে।
-"আচ্ছা মায়া কি কোনো কারণে আমার উপর রাগ বা অভিমান করে আছে? যেটা সে আমার কাছে প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। কিন্তু মায়া তো এমন মেয়ে নয়। বিয়ের এতো মাস হয়ে গেল মায়া আজ পর্যন্ত কখনো আমার সাথে কোনো বিষয় নিয়ে রাগ বা অভিমান করেছে বলে মনে হয়না। মাঝেমধ্যে সে আমাকে তার জন্য এটা-সেটা নিয়ে আসতে বলত। যদিও আমি কোনোদিন ভুলবশত সেটা নিয়ে যেতে ভুলে যেতাম তবুও সে আমার উপর রাগ করত না। আরও বলত পরেরদিন যেন মনে করে নিয়ে আসি। এইসব বিষয় নিয়ে মায়া রাগ করার মতো মেয়ে না। তাহলে সে কেন এমন করছে? নাকি কোনো বিষয় নিয়ে তার মন খারাপ? তাই হয়তো সে আমাকে এড়িয়ে চলছে।"
-"কি হলো তামিম ভাই, এতো কি ভাবছেন? লাঞ্চ টাইম তো শেষ হতে চললো, লাঞ্চ করবেন না?"
হঠাৎ তামিমের পাশের ডেক্সের মিরাজ নামের ছেলেটা কথাটা বলে উঠলো। সে লাঞ্চ করে এসে অনেক্ষণ যাবত দেখছে তামিম কিছু একটা ভেবে চলছে। তাই সে তামিমের দিকে তাকিয়ে উপরোক্ত কথাগুলো বলে উঠলো। মিরাজের কথায় তামিম ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে আর মিরাজের দিকে দৃষ্টি ফেলে বলে,
-"হ্যাঁ করবো। আপনি লাঞ্চ করে ফেলেছেন?"
-"হ্যাঁ একটু আগে করে আসলাম। আর বেশি সময় বাকি নেইতো যান গিয়ে করে আসেন।"
-"হ্যাঁ যাব।"
এরপর তামিম তার মোবাইলটা হাতে নিয়ে মায়ার নাম্বারে কল দিল। প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল মায়া কল ধরলো না। তাই সে আবার মায়ার নাম্বারে কল দিল। এবার মায়া কলটা রিছিভ করলো।
-"এতো কল দিচ্ছেন কেন?" কিছুটা রাগী গলায়।
-"তুমি তো আজ একবারের জন্যও কল দিলে না। তাই আমিই এখন কল দিলাম। সকালে নাস্তা করেছিলে?"
-"হুম।"
-"দুপুরের খাবার খেয়েছ?"
-"হুম। আপনিও খেয়ে নেন। এখন রাখছি বাই।" কথাটা বলেই মায়া কল কেটে দিল।
মায়ার এমন ব্যবহারে তামিম এবার আরও অবাক হলো। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে মায়া খাবার খেয়ে নিয়েছে এটা শুনে। কারণ মায়া তো আজ পর্যন্ত কোনোদিনও তার আগে খাবার খায়নি। তাহলে আজ মায়া তার আগে খাবার খেয়ে নিল কিভাবে? আর একবার তাকে ফোনও তো করলো না। তবুও তামিম নিজেকে শান্তনা দেওয়ার জন্য নিজেই নিজেকে বললো, "হয়তো মায়ার অনেক ক্ষুধা লেগে গেছিল তাই আমার আগে খেয়ে নিয়েছে।" তারপর তামিমও অফিস ক্যান্টিনে গিয়ে হালকা কিছু খেয়ে নিল।
.
রাতেরবেলা তামিম বাসায় এসে বাসার কলিংবেল বাজানোর কিছুক্ষণ পরে মায়া এসে দরজা খুলে দিল। দরজা খুলে দিয়ে মায়া চুপচাপ রুমে চলে আসলো। তামিমও দরজাটা লাগিয়ে মায়ার পিছু পিছু রুমে এসে ঢুকলো। তারপর অফিসের ব্যাগটা বিছানায় রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে তামিম মায়াকে বললো,
-"রাতের রান্না-বান্না শেষ?"
-"আজ রান্নাই করি নি।"
-"তাহলে দুপুরে খেলে কি?" একটু অবাক হয়ে।
-"খাইনি।"
-"কিন্তু তুমি না বললে..."
-"মিথ্যা বলেছিলাম।"
-"কেন রান্না করনি?"
-"ক্ষুধা লাগেনি তাই।"
-"তোমার কি শরীর খারাপ?"
-"নাহ।"
-"আচ্ছা তুমি থাক আমি তাহলে রান্নাঘরে গিয়ে রাতের জন্য কিছু একটা রান্না করি।"
-"আপনার কিছু করা লাগবে না। আপনি রেস্ট নেন, আমি গিয়ে রান্না করছি।" বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
.
রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে ঢুকতেই তামিম দেখলো তার ফোনটা বেজে চলছে। তামিম তাড়াতাড়ি করে ফোনের কাছে এসে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে তার আব্বু কল দিয়েছেন। সে তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। চাকরির জন্য তামিমের এই শহরে আসা। চাকরি পেয়ে যাওয়াতে তার মা-বাবা তাকে এই শহরের একটা মেয়ে মানে মায়ার সাথে তার বিয়ে করিয়ে দেন। সেই থেকে তামিম এই শহরে স্যাটেল হয়ে গেছে। তার মা-বাবার শহর ভালো লাগে না বিধায় তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে থাকেন।
-"আসসালামু ওয়ালাইকুম আব্বু। কেমন আছেন?"
-"ওয়ালাইকুম আসসালাম। এইতো আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি। তুই আর বউমা কেমন আছিস?
-"আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আম্মু কেমন আছেন?"
-"ভালোই আছেন। আর তোর আম্মু চাচ্ছেন কিছুদিনের জন্য তোদের এইখানে বেড়াতে আসতে চাচ্ছেন।"
-"তাহলে তুমি একদিন আম্মুকে নিয়ে চলে আস আমাদের এইখানে। আম্মুকে দিয়ে তুমিও কিছুদিন থেকে গেলে।"
-"হ্যাঁ এটাই করবো ভাবছি। দেখি কবে আসতে পারি।"
-"আচ্ছা আসার দুইদিন আগে আমায় ফোন করে বলিও আমি তোমাদের জন্য বাসের টিকেট কেটে রাখবো নে।"
-"আচ্ছা ঠিক আছে। এখন তাহলে রাখছি।" বলেই অপাশ থেকে রহিম মিয়া কলটা কেটে দিলেন।
তামিম আর মায়ার বিয়ের প্রথম কয়েকদিন তার আম্মু তাদের সাথেই ছিলেন। তারপর যে গ্রামে গেলেন আর তাদের আসলেন না। কিছুক্ষণ পর মায়া রুমে আসলে তামিম মায়াকে বললো,
-"কয়েকদিন পর আম্মু আমাদের এইখানে আসছেন।"
-"ওহ ভালো তো।" শুকনো মুখে।
মায়া আর কিছু না বলে রুমের লাইট অফ করে বিছানার একপাশে গিয়ে শুয়ে পরল। তামিমও আর কথা না বাড়িয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল।
.
মধ্যরাতে হঠাৎ কারও কথা বলার শব্দে মায়ার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ঘুম চোখে মায়া বিছানার অন্যপাশে তাকিয়ে দেখে তামিম নেই। তামিমকে বিছানায় না দেখে মায়া কিছুটা চমকে উঠে। পরক্ষণেই মায়া বারান্দায় তামিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হয়। মায়া আস্তে করে বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। মায়া দেখে তামিম কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে। তখন তামিম ফোনের অপর ব্যক্তিটাকে বলছে, "আচ্ছা তাহলে আমরা কালকে দেখা করছি এটাই ফাইনাল।" তামিমের কথাটা শুনে মায়ার মনে এবার তামিমের প্রতি আরেকটু সন্দেহ জেগে উঠলো। তাহলে কি ওই আননোন নাম্বারের ব্যক্তিটা সত্যিই বলেছে?
.
.
.
.
.
Loading.......
বিঃদ্রঃ গল্পটা কেমন হয়েছে একটা গঠনমূলক কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন, হ্যাপি রিডিং ❤️
~~সবাই নিয়মিত নামাজ পড়বেন আর নামাজের লাভ জানিয়ে অন্যদেরকে দাওয়াত দিবেন~~


0 Comments