আমাদের_সংসার

#লেখকঃ- Tamim

#পর্বঃ- ৩

,,

,,

-"এতো রাতে কার সাথে কথা বলছেন আপনি?"


কোনোকিছু না ভেবেই মায়া তামিমকে উপরোক্ত প্রশ্নটা করে বসে। এতে তামিম খানিকটা চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। তার ঠিক পিছন বরাবর মায়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তামিম কিছুটা ঘাবড়ে যায়। তামিম সাথে সাথে মায়ার অগোচরে কলটা কেটে দেয়। কিন্তু সেটা মায়ার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। এদিকে তামিম মনে মনে ভাবছে, "মায়াকে তো ঘুমে রেখে এলাম তাহলে সে জেগে উঠলো কিভাবে? আর সে আমার কথাগুলো শুনে ফেলেনি তো?"


-"কি হলো চুপ করে আছেন কেন বলেন?" মায়া পুনরায় প্রশ্নটা করে।


-"না মানে একটা ফ্রেন্ড কল দিয়েছিল।"


-"এতো রাতে?" কপাল কুচকে।


-"আসলে ও বাহিরের দেশে থাকে। আমাদের এইখানে রাত হলেও তার ওইখানে দিন।"


-"উনার সাথেই কি কাল দেখা করতে যাবেন?"


-"মানে?" কপাল ভাঁজ করে।


-"আপনিই তো একটু আগে বললেন যে কাল তাহলে আমরা দেখা করছি এটাই ফাইনাল।"


মায়ার কথা শুনে তামিম এবার গভীর ভাবনায় পরে যায়। এখন মায়াকে সে কি বলবে এটাই ভেবে পাচ্ছে না। তামিম মনে মনে বলে, "দুর! প্রথমেই বলে দিতাম যে অফিসের একটা কলিগ ফোন করেছে তাহলে তো আর এতো সমস্যায় পরতে হতো না। এখন কি বলবো তাকে?"


-"কি এতো ভাবছেন আপনি?"


-"না কই কি ভাবছি, কিছু না তো। আসলে ও কাল দেশে আসছে। আর আমাকে রিকুয়েস্ট করছে আমি যেন তাকে এয়ারপোর্ট থেকে পিক করি। তাই বাধ্য হয়ে ওর কথায় রাজি হয়ে গেলাম।"


-"উনি কাল দেশে আসছেন আর এটা আপনাকে ফোন করে এখন জানাচ্ছেন! কেন উনি আগে..."


-"মাত্র এক সপ্তাহ আগেই দেশে আসার প্ল্যান করেছে আর টিকেটও বুক করেছে। তাই আমাকে এই বিষয়ে আজকে জানালো।"


-"এটা তো কয়দিন আগেও..."


-"উফ এইখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে যাচ্ছি। আর ঘুমটাও এখনো ঠিকমতো পূরণ হয়নি তাই শরীরটা কেমন যেন করছে। চল ভিতরে চল, অযথা এইখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে ঘুমিয়ে পড়ি।" কথাগুলো বলেই তামিম রুমের ভিতরে চলে আসলো। আর বিছানায় উঠে কম্বল গায়ে জড়িয়ে চোখ বুজে শুয়ে পরল।


তামিমের কথায় মায়া কেন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে।

"উনি কার সাথে এতক্ষণ ফোনে কথা বলছিলেন? উনার কোনো ফ্রেন্ডের সাথে নাকি অন্য কারও সাথে? কিন্তু উনি তো বললেন উনার একটা বিদেশের ফ্রেন্ড ফোন দিয়েছিল। উনি কি আদৌ আমায় সত্যি বলেছেন?" কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মায়া বিছানায় উঠে বসে। আর তামিমের ঘুমন্ত চেহারার দিকে এক পলক তাকিয়ে কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে অন্যপাশ হয়ে শুয়ে পরে।


.

পরেরদিন ঠিক সন্ধ্যাবেলা মায়ার ইমুতে আবার ওই আননোন নাম্বারটা থেকে একটা মেসেজ আসে। মায়া তখন রুমে বসে বসে তার একটা বান্ধবীর সাথে WhatsApp এ চ্যাট করছিল। মেসেজ এসেছে দেখে মায়া ইমুতে ঢুকে দেখে ওই আননোন নাম্বারটা থেকে তাকে একটা ভিডিও পাঠানো হয়েছে। ভিডিওর সাথে একটা মেসেজও দেওয়া হয়েছে, "আপনার স্বামীর চরিত্রটা কেমন একটু দেখে নেন।" মায়া অনেক আগ্রহ নিয়ে ওই ভিডিওটা প্লে করে। ভিডিওটা ছিল মূলত ত্রিশ সেকেন্ডের। আর এই ত্রিশ সেকেন্ডের ভিডিওটা দেখে মায়ার চারপাশ যেন অন্ধকার হতে শুরু করে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে তামিম একটা মেয়েকে নিয়ে একটা আবাসিক হোটেলে ঢুকছে। দু'জনে ওই আবাসিক হোটেলে ঢুকতেই ভিডিওটা শেষ হয়ে যায়। এটা কি সত্যিই তামিম নাকি অন্যকেউ এটা বোঝার জন্য মায়া আরও কয়েকবার ভিডিওটা দেখে। ভিডিওতে তামিমের মতো ছেলেটা একটা সাদা-কালো রঙের শার্ট পরে আছে। যেই শার্ট আজকে তামিমও পরেছে। আর ভিডিওতে তামিমের চেহারাটাও অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এতে মায়া পুরোপুরি শিওর হয়ে যায় যে এটাই তামিম। আর ওর সাথে থাকা মেয়েটা হয়তো ওর পরকীয়ার সাথি। তামিমের প্রতি এবার মায়ার একপ্রকার ঘৃণা সৃষ্টি হতে লাগলো।

"এতদিন ধরে আমি একটা মানুষের সাথে সংসার করে আসছি যে কি না বিয়ের পর নিজের স্ত্রী রেখে বাহিরের মেয়েদের সাথে পরকীয়া করে বেড়াচ্ছে ছিঃ! এমন একটা মানুষের সাথে এতদিন যাবত থেকেও ওই মানুষটা কেমন সেটা বুঝতে পারলাম না? নাহ এই মানুষটার সাথে আমি আর সংসার করতে পারবো না, কিছুতেই না।" মনে মনে কথাগুলো বলেই মায়া উঠে গিয়ে তার জামা-কাপড় বের করে একটা লাগেজে ভরতে শুরু করলো। নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু লাগেজে ঢুকানো শেষে মায়া একটা ছোট্ট কাগজে তামিমের উদ্দেশ্যে কিছু কথা লিখে সেটা টেবিলের উপর রেখে লাগেজটা নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পরল। বাসা থেকে বেরুনোর আগে শেষবারের মতো একবার পুরো বাসাটা দেখে নিল। কত সৃতিই না জড়িয়ে আছে এই বাসাতে তার আর তামিমের। সব সৃতি রেখে তাকে আজ তামিমকে একা ফেলে এই বাসা থেকে চলে যেতে হচ্ছে।


.

রাত আটটার দিকে তামিম বাসায় আসতেই দেখলো বাসার দরজা খোলা। এই সময়ে দরজা খোলা দেখে তামিম কিছুটা চমকে উঠে। বাসায় চোর টোর ঢুকলো না তো আবার? তামিম আর বেশি কিছু না ভেবে দ্রুতগতিতে বাসার ভিতরে এসে ঢুকলো। আর তাড়াতাড়ি করে তাদের রুমে চলে আসলো। রুমে এসে মায়াকে কোথাও দেখতে না পেয়ে তামিম "মায়া" "মায়া" বলে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো। কিন্তু মায়ার কোনো সাড়া পেল না। মায়ার সাড়া না পেয়ে তামিমের মনে এবার একধরণের ভয় শুরু হতে লাগলো। বাসায় ডাকাত এসে মায়াকে কিডন্যাপ করে নিল গেল না তো আবার? তামিম এবার ভালো করে পুরো বাসা তন্নতন্ন করে মায়াকে খুঁজতে শুরু করলো। কিন্তু কোথাও মায়াকে পেল না। মায়াকে না পেয়ে তামিম আবার রুমে চলে আসলো। রুমে এসে ঢুকতেই টেবিলে থাকা একটা ছোট্ট চিরকুট তামিমের চোখে পরে। তামিম দ্রুতগতিতে টেবিলের কাছে এসে চিরকুটটা হাতে নিয়ে সেটা পড়তে শুরু করে।


-"কি দিয়ে কথা শুরু করবো সেটা বুঝতে পারছি না। তবে শর্ট করে একটা কথা বলে দেই, আমি আর আপনার সাথে সংসার করতে পারবো না। কারণ যেই মানুষটা নিজের বাসায় স্ত্রী রেখে অন্য নারীদের সাথে পরকীয়া করে বেড়ায় তার সাথে কখনো সংসার করা যায়না। তাই আমি ঠিক করেছি আপনার সাথে আর সংসার করতে পারবো না। যার সাথে এখন অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছেন পারলে তাকে বিয়ে করে নিজেদের সম্পর্কটা বৈধ করে নিয়েন। আরেকটা কথা, আমার সাথে আর কখনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না। আল্লাহ হাফেজ।"


চিরকুটের উক্ত লেখাগুলো পড়ে তামিমের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এই লেখাগুলো মায়া নিজেই লিখেছে। কিন্তু মায়া এইসব পরকীয়া, বৈধ-অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে কি লিখেছে সেটা তামিমের বুঝে আসছে না। সে আবার কখন কোন নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়ালো? তামিম এসব বিষয় নিয়ে ভাবছে এমন সময় হঠাৎ তার পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা বের করে দেখে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। তামিম কিছু না ভেবেই কলটা রিছিভ করে।


-"এতক্ষণে নিশ্চয়ই তোমার স্ত্রী তোমায় ছেড়ে চলে গেছে? যাবেই না কেন ওকে যেভাবে তোমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছি তাতে এমনটা হওয়ারই কথা। আমি বলেছিলাম না তোমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েই ছাড়বো। আর তুমি তো জানই আমি একবার মুখ দিয়ে যা বলি তা করেই দেখাই। দেখলে তো এবার নাকি হাহাহা।" ফোনের ওপাশ থেকে একটা নারী কণ্ঠে কথাগুলো ভেসে উঠলো।


ফোনের উক্ত নারী কণ্ঠস্বর শুনে তামিমের আর বুঝতে বাকির রইলো না যে মেয়েটা কে। আর এই মেয়েটাই যে তাদের দু'জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে তামিম এটা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।


-"এখন তো তোমার স্ত্রী তোমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে। এবার তো চলে আস আমার কাছে। আমি এখনো তোমার জন্য..."


ফোনের ওপাশে থাকা নারীটার কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই তামিম কলটা কেটে দেয়। এই মেয়েটাকে সে এতোটাই ঘৃণা করে যে মেয়েটার কণ্ঠটা অবধি সে শুনতে পারে না।


.

এদিকে রুমের বারান্দায় বসে থাকা একটা মেয়ে জোরে জোরে পৈশাচিক হাসি হাসছে। অনেক সাধনার পর অবশেষে সে তার কাজটা সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। যদিও এতে তার তেমন কোনো কষ্ট করতে হয়নি তবুও এই কাজটা করে সে আজ ভিষণ খুশি। এখন শুধু তার আরেকটা কাজ করা বাকি রয়েছে। সেটা হলো তামিমকে তার জীবনসঙ্গী বানানো। এটা অবশ্য অনেক কঠিন একটা কাজ তবুও এটা উক্ত মেয়েটার কাছে অনেক সহজসাধ্য একটা কাজ।


.

রাত নয়টার দিকে হঠাৎ হাসান চৌধুরীর বাসার কলিং বেল বেজে উঠলো। কাজের মেয়ে শিলা গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। দরজা খুলে সামনের মানুষটাকে দেখেই সে বলে উঠলো, "মায়া আপা আপনি!"


-"কে এসেছে রে শিলা?"


-"মায়া আপা এসেছে খালু।"


মায়া এসেছে শুনে হাসান সাহেব খানিকটা চমকে উঠলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সবে নয়টা বেজেছে। এতো রাতে মায়া কিভাবে আসবে? সত্যিই কি মায়া এসেছে এই বিষয়ে শিওর হওয়ার জন্য হাসান সাহেব ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন সত্যি সত্যি মায়া এসেছে। মায়ার হাতে একটা বড় লাগেজ দেখে তিনি একটু অবাক হলেন। সাথে সাথে মায়ার দিকে দৃষ্টি ফেলে বললেন,


-"আরে মামণি তুমি এতো রাতে এইখানে! সাথে কেউ আসেনি মানে জামাই কোথায়? আর এতো বড় লাগেজ কেন?"


-"সবকিছু নিয়ে একেবারে চলে এসেছি তাই।"


-"সবকিছু নিয়ে চলে এসেছ মানে!" খানিকটা অবাক হয়ে।


-"পরে বলবো এখন আমার ভালো লাগছে না। আমি একটু রুমে গেলাম।" বলেই লাগেজটা নিয়ে মায়া নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।


মায়ার কথায় হাসান সাহেব কিছু বুঝতে না পেরে ওইখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। এমন সময় হঠাৎ উনার ফোনটা বেজে উঠলো। ড্রয়িংরুমে এসে দেখলেন তামিম ফোন দিয়েছে। তিনি সাথে সাথে ফোনটা রিছিভ করলেন।


-"আসসালামু ওয়ালাইকুম। বাবা মায়া কি আপনাদের বাসায় এসেছে?"


-"ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাঁ মাত্রই তো এলো। কিন্তু ও একা কেন তুমি ওর সাথে আসলে না যে।"


-"আমি আসছি কিছুক্ষণের মধ্যেই। এসে আপনাকে সব বলছি। এখন রাখছি তাহলে, আসসালামু ওয়ালাইকুম।" কথাগুলো বলেই তামিম কল কেটে দেয়।


এদিকে হাসান সাহেবের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এতো রাতে মায়া এতো বড় একটা লাগেজ নিয়ে একা একাই বাসায় চলে আসলো। আর এখন আবার তামিম ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছে মায়া বাসায় এসেছে কি না। আবার বলছে আমিও কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় আসছি। কি হচ্ছে কিছুই তো বুঝে আসছে না। একে অপরের সাথে তাদের ঝগড়া হলো না তো আবার?

.

.

.

.

.

Loading.......


বিঃদ্রঃ গল্পটা কেমন হয়েছে অবশ্যই একটা গঠনমূলক কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন, হ্যাপি রিডিং ❤️


~~সবাই নিয়মিত নামাজ পড়বেন আর নামাজের লাভ জানিয়ে অন্যদেরকে দাওয়াত দিবেন~~