আমাদের_সংসার

#লেখকঃ- Tamim

#পর্বঃ- ৪

,,

,,

বর্তমানে তামিম মায়াদের বাসায় এসে মায়ার আম্মু-আব্বুর সামনে বসে আছে। উদ্দেশ্য হলো মায়াকে এইখান থেকে বাসায় নিয়ে যাওয়া। আর মায়া কোন কারণে তাকে ছেড়ে সবকিছু নিয়ে এইখানে চলে আসলো এই কারণটা জানা। মায়াদের বাসায় আসার পর থেকেই তামিম লক্ষ্য করছে মায়ার আম্মু তার দিকে বাকা চোখে তাকিয়ে আছেন। অবশ্য তাকানোরই কথা। মায়ার আম্মু তামিমকে শুরু থেকেই পছন্দ করতেন না। তা ছাড়া তামিমের সাথে মায়ার বিয়ে হোক উনি এটাও চাইতেন না। এটা তামিম প্রথমদিকেই বুঝতে পেরেছিল। তিনি মায়ার আব্বুর মুখের উপর কিছু বলতে পারেন না বিধায় উনাকে তাদের বিয়েতে সম্মতি প্রকাশ করতে হয়। মায়ার আম্মুর এমন বাকা চোখে তাকানো দেখে তামিম বুঝতে পারছে উনি আজ সুযোগ পেলে তাকে একটু কথা শুনিয়ে দিবেন।


-"বাবা মায়া কোথায়?" মায়ার আব্বুর দিকে দৃষ্টি ফেলে তামিম কথাটা বললো।


-"মায়া কোথায় সেটা জেনে তুমি কি করবা? শুধু এটা জেনে রাখ মায়া এখন যেখানেই আছে অনেক ভালো আছে।" মায়ার আব্বু কিছু বলার আগেই মায়ার আম্মু তামিমের দিকে রাগী লুক ফেলে উক্ত কথাটা বলে উঠলেন।


-"এসব কোন ধরণের কথা মমতা? মেয়ের জামাইয়ের সাথে কেউ এইভাবে কথা বলে?" হাসান সাহেব উনার স্ত্রীর উপর কিছুটা রাগ দেখিয়ে উক্ত কথাটা বললেন।


-"যেই ছেলের সাথে আমার মেয়েটা ভালো করে ৪ মাস সংসার করতে পারল না সে আবার কেমন জামাই! প্রথমদিকেই বলেছিলাম এমন ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিও না। মেয়েটা সুখী হতে পারবে না। কিন্তু তুমি তো আমার কথা শুনলেই না। দেখ এবার এর ফলাফল কি বের হলো। এই ছেলেটা নিশ্চয়ই যৌতুকের জন্য আমার মেয়েটার উপর দিনের পর দিন অত্যাচার করে এসেছে। তাইতো আজ মেয়েটা সবকিছু নিয়ে আমাদের কাছে চলে এসেছে।" অনেকটা ইমোশনাল হয়ে কথাগুলো বললেন মমতা বেগম।


-"আহা কি আবোল তাবোল কথা বলছ এইসব! তুমি এখন যাওতো আর আমাকে একটু ওর সাথে কথা বলতে দাও।" খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে কথাগুলো বললেন হাসান সাহেব।


-"এতকিছুর পরেও তুমি এই ছেলেটার সাথে কথা বলতে চাচ্ছ! তুমি কি..."


-"তুমি যাবে এইখান থেকে?" খানিকটা রাগ দেখিয়ে।


হাসান সাহেবের রাগ দেখে মমতা বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না। স্বামীকে তিনি যথেষ্ট সম্মান করেন আর মেনে চলেন। তাই কখনো উনার মুখের উপর কিছু বলতে পারেন না। সেসময়কার মতো মমতা বেগম ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে মায়ার রুমের দিকে পা বাড়ালেন।


-"মায়ার আম্মুর কথায় তুমি কিছু মনে কর না বাবা।" বিনীতভাবে বললেন কথাটা।


-"আরে না না এইখানে মনে করার কি আছে। মায়ের জায়গায় অন্যকেউ হলে এমনটাই বলতো।"


-"আচ্ছা আমায় একটা কথা বল তো। তোমাদের মধ্যে কি কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছে?"


-"বাবা এ বিষয়ে আপনাকে পরে বলবো, আগে আমি মায়ার সাথে একটু কথা বলতে চাই। যদি আপনি অনুমতি দেন।"


-"এইখানে অনুমতির কি আছে। মায়া ওর রুমেই আছে। যাও গিয়ে কথা বলে আস।"


-"আচ্ছা তাহলে আপনি থাকেন আমি গিয়ে ওর সাথে কথা বলে আসি।" কথাটা বলে তামিম সেখান থেকে উঠে মায়ার রুমের দিকে পা বাড়ালো।"


.

-"ওই ছেলেটা হয়তো তোকে নিতে এসেছে। কিন্তু খবরদার তুই একদম ওর সাথে যাবি না বলে দিলাম।"


-"ওই ছেলেটা মানে? কার কথা বলছ তুমি?"


-"তামিমের কথা বলছি।" মুখে একরাশ রাগ নিয়ে।


-"উনি কখন বাসায় আসলেন?" খানিকটা অবাক হয়ে।


-"মিনিট পাঁচেক আগে।"


-"ওহ।"


-"শুন তোকে একটা কথা বলি, ওই ছেলেটা যদি এখন এসে..."


-"ভিতরে আসবো?" বাহির থেকে তামিম উক্ত কথাটা বললো।


-"এসেই তো পরেছ, আর অনুমতি নেওয়ার কি আছে?" তামিমকে ভেঙ্গ করে মায়ার আম্মু উক্ত কথাটা বললেন।


-"মা আপনি তাহলে এখন একটু বাহিরে যান আমি একটু মায়ার সাথে কিছু কথা বলবো।" ভিতরে ঢুকে।


মায়ার আম্মু কিছু না বলে মায়ার দিকে তাকিয়ে কি যেন ইশারা করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর তামিম একটু মায়ার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। এরপর তামিম কিছু বলতে যাবে তার আগেই মায়া বলে উঠলো,


-"কেন এসেছেন এইখানে?"


-"তোমার সাথে একটু কথা বলতে।"


-"কিন্তু আপনার সাথে আমার কোনো কথা বলার ইচ্ছা নেই।"


-"শুধু পাঁচ মিনিট, এর বেশি কথা বলবো না।"


-"কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলেন?"


-"হঠাৎ সবকিছু নিয়ে এইখানে চলে আসলে যে। আমাকে কি তোমার ভালো লাগে না? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?"


-"এমন একটা জঘন্যতম কাজ করে এখন ভালো সাজার চেষ্টা করছেন? কি ভেবেছেন আমি কিছু জানি না বা কখনো কিছু জানতে পারবো না?"


-"দেখ কেউ একজন আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য ষড়যন্ত্র করছে। আর সে তোমাকে যা যা বলেছে তার সবই মিথ্যা বলেছে।"


-"ওহ মিথ্যা বলেছে তাইনা? তাহলে এটা কি? এই ভিডিওটায় যা দেখা যাচ্ছে তার সবটাই কি মিথ্যা?" কথাগুলো বলেই মায়া তার মোবাইলটা হাতে নিয়ে সেই ভিডিওটা প্লে করে তামিমের সামনে ধরলো।


৩০ সেকেন্ডের ভিডিওটা দেখার পর তামিম অপরাধীর ন্যায় একদম চুপ হয়ে গেল। এখন তার কি বলা উচিৎ বা সে কি বলবে সেটাই বুঝতে পারছে না।


-"কি হলো এখন কথা বলছেন না কেন? বলেন এই ভিডিওটায় যা দেখা যাচ্ছে তা মিথ্যা।"


-"এই ভিডিওটা তোমায় কে দিয়েছে?"


-"সেটা আপনার না জানলেও চলবে। আপনার আর কিছু বলার থাকলে বলে বিদায় হোন।"


-"নাহ আমার আর কিছু বলার নেই।"


-"তাহলে চলে যান এইখান থেকে আর দ্বিতীয়বার এইখানে আসা বা আমার সাথে যোগাযোগ করার চিন্তাও করবেন না।"


-"আচ্ছা।"


-"আর শোনেন, কিছুদিনের মধ্যে ডিভোর্স প্যাপার পাঠিয়ে দিব সেটাই একটা সাইন করে দিবেন।"


তামিম আর কিছু না বলে মায়ার রুম থেকে বেরিয়ে আবার ড্রয়িংরুমে চলে আসলো। এসে দেখলো হাসান সাহেব ঠিক আগের জায়গাতেই বসে আছেন। তামিম উনার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো,


-"বাবা আজ আমি আসি অন্য আরেকদিন নাহয় আবার আসবো।"


তামিমের কথা শুনে হাসান সাহেব মুখ তুলে তার দিকে তাকালেন আর বললেন,


-"মায়া যাবে না তোমার সাথে?"


-"নাহ।"


হাসান সাহেব এবার বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন আর তামিমের ঘাড়ে হাত রেখে বললেন,


-"আমি চাইলে মায়ার বিয়েটা আরও ধনী পরিবারের ছেলের সাথে করাতে পারতাম। কিন্তু সেসব ছেলেরা হয়তো আমার মেয়েটাকে সারাজীবন সুখে রাখতে পারবে না যতটা তুমি পারবে। আমি এমনি এমনি তোমার কাছে আমার মেয়ের বিয়ে দেইনি। প্রথমে তোমার চালচলন দেখেছি তারপর ভেবে দেখলাম যে তুমিই আমার মেয়ের জন্য পারফেক্ট। এতো মাস ধরে তো তোমাদের সম্পর্কটা ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ কি এমন হলো যে মায়া সবকিছু নিয়ে এইখানে চলে আসলো? তোমাদের মধ্যে কি হয়েছে সেটা আমি জানতে চাইব না। তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাঝেমধ্যে রাগ, অভিমান, ঝগড়াঝাঁটি ইত্যাদি হয়েই থাকে, এটা স্বাভাবিক। তোমাদের মধ্যেও হয়তো এমন কিছু একটা হয়েছে। তোমাদের মধ্যে যা কিছুই হয়ে থাকুক তোমরা নিজেরাই এটার সমাধান করবে আশা করি। এইখানে আমরা কেউ মাথা ঘামাবো না। তবে কোনোপ্রকার সহযোগিতা লাগলে অবশ্যই আমাকে বলবে।"


-"আচ্ছা বাবা। আমি তাহলে আজকে যাই?"


-"রাত তো অনেক হলো, খাওয়া দাওয়া করে আজকে নাহয় এইখানেই থেকে যাও। সকাল হলে নাহয়..."


-"না বাবা বেশি রাত হয়নি, চলে যেতে পারবো। তা ছাড়া সকালে অফিসেও যেতে হবে, থাকলে হবে না। অন্য আরেকদিন আসলে থাকা খাওয়া দুইটাই হবে।"


-"তোমার যেটা ভালো মনে হয়।"


-"আচ্ছা তাহলে আজ আমি গেলাম। আসসালামু ওয়ালাইকুম।"


-"ওয়ালাইকুম আসসালাম।"


তারপর তামিম মায়াদের বাসা থেকে বেরিয়ে বাস স্টেশনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। খানিকটা পথ এগুতেই হঠাৎ তামিমের ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে তার আব্বু কল দিয়েছেন। কিছু না ভেবেই তামিম কলটা রিছিভ করলো।


-"আসসালামু ওয়ালাইকুম। হে আব্বু বল?"


-"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আজকে আমি আর তোমার আম্মু বাসে উঠে পরেছি। সকাল নাগাদ তোমাদের ওইখানে চলে আসবো।"


-"আজকেই রওনা দিচ্ছ?" মানে এতো তাড়াতাড়ি!"


-"হ্যাঁ, আমি তো বললামই কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার আম্মুকে নিয়ে চলে আসবো। কেন আমরা আসলে কি তোমাদের সমস্যা হবে?"


-"আরে না না এসব তুমি কি বলছ আব্বু। আমাদের সমস্যা হবে কেন? আসলে এতো তাড়াতাড়ি যে তোমরা চলে আসবে এটা বুঝতে পারিনি। আচ্ছা বাস থেকে নেমে আমায় একটা ফোন দিও, আমি এসে তোমাদেরকে নিয়ে যাব।"


-"আচ্ছ ঠিক আছে। এখন তাহলে রাখছি বাস ছেড়ে দিবে এখন।" কথাটা বলেই অপাশ থেকে রহিম মিয়া কলটা কেটে দিলেন।


এদিকে কথা বলা শেষে তামিম রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো, "আম্মু-আব্বু কালকে চলে আসবেন। এসে যদি মায়াকে বাসায় না দেখে তারা আমায় মায়ার কথা জিজ্ঞেস করেন তাহলে আমি কি বলবো? সত্যিটা তো বলা যাবে না। কারণ এটা বললে তারা আমাকেই দোষী মনে করবেন। তাহলে কি বলবো? আচ্ছা এ বিষয়ে কালকে ভাবা যাবে। এখন আগে বাসায় যাই।" কথাগুলো ভেবে তামিম আবার বাস স্টেশনের দিকে পা বাড়ালো।

.

.

.

.

.

Loading....... 



~~সবাই নিয়মিত নামাজ পড়বেন আর নামাজের লাভ জানিয়ে অন্যদেরকে দাওয়াত দিবেন~~