আমাদের_সংসার
#লেখকঃ- Tamim
#পর্বঃ- ৫ (শেষ পর্ব)
,,
,,
মধ্যরাতে হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজে তামিমের ঘুম ভেঙে গেল। কে যেন একাধিকবার বাসার কলিং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে। তামিম দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ভোর পাঁচটা বেজে গেছে। এই সময় আবার কে কলিং বেল বাজাচ্ছে! হঠাৎ তার মনে হলো আজকে তো আম্মু-আব্বুর আসার কথা, ওরা চলে আসেনি তো? তামিম এবার তাড়াহুড়া করে শোয়া থেকে উঠে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে বাসার মেইন দরজার কাছে চলে আসলো। তামিম যেটা ভাবছিল সেটাই হলো। তার আম্মু-আব্বু এসেছেন আর তারাই এতক্ষণ বাসার কলিং বেল বাজাচ্ছিলেন।
-"আরে তোমরা এতো জলদি চলে আসলে যে। আর বাস স্টেন্ড এসে আমায় ফোন দিতে বললাম ফোন দিলা না কেন?"
-"এইসময়ে তোকে ফোন দিব তারপর তুই বাস স্টেন্ড আসবি, এসে আমাদের নিয়ে যাবি তাই তোর আব্বু আর তোকে ফোন দেননি। তা ছাড়া বাস থেকে নামার কিছুক্ষণ পরেই একটা রিক্সা পেয়ে যাই। সেটা নিয়েই এইখানে চলে আসি।" তামিমের আম্মু রাহেলা বেগম বললেন উক্ত কথাগুলো।
-"আচ্ছা যাও এসেই যখন পরেছ তাহলে হলো। আস এখন ভিতরে আস।"
-"বউমা কোথায় রে?" রাহেলে বেগম তামিমের দিকে দৃষ্টি ফেলে কথাটা জিজ্ঞেস করলেন।
তামিম তার আম্মুর কথা শুনে ভাবনায় পরে যায় এখন সে উনাকে কি বলবে। সত্যিটা বললে যদি তারা তাকে খারাপ ভাবে। মিথ্যা কিছু একটা বানিয়ে বলতে হবে তাহলে। তারপর আবার সকালে জিজ্ঞেস করলে সত্যিটা বলে দিব। ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে তামিম বলে উঠলো,
-"ঘুমিয়ে আছে।"
-"ওহ।"
তারপর তামিম তার আম্মু-আব্বুকে একটা রুমে নিয়ে আসলো। এসে হাত মুখ ধুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতে বললো। অতঃপর সে নিজেও তার রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পরল।
.
-"আসার পর তুই না বললি বউমা ঘুমিয়ে আছে। কই তাকে তো এখন অবধি কোথাও দেখলাম না।"
সকালবেলা নাস্তার টেবিলে বসে তামিম তার আম্মু-আব্বুকে নিয়ে নাস্তা খাচ্ছিল। ওই মূহুর্তে হঠাৎ তামিমের আম্মু রাহেলা বেগম তার দিকে তাকিয়ে উক্ত প্রশ্নটা করে বসলেন। তামিম তার আম্মুর কথা শুনে খানিকটা ভেবে বললো,
-"আসলে মায়া তাদের বাসায় গিয়েছে। অনেকদিন যাবত তার আম্মু অসুস্থ। তাই তার আম্মুকে একটু দেখতে গেছিল। কিন্তু উনার শরীরটা এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি তাই সে এখনো সেখানেই রয়েগেছে।"
-"আমরা যে আজকে আসবো সেটা বউমা জানে?" পাশ থেকে রহিম মিয়া জিজ্ঞেস করলেন।
-"হ্যাঁ জানে তো। কিন্তু তার আম্মু কিছুটা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কিভাবে বাসায় আনি বল? তবে তোমরা বললে তাকে আজকেই বাসায় নিয়ে আসবো। বল তাকে কখন আনতে যাব?"
-"এখন আপাতত বউমাকে আনার দরকার নেই। আগে তার আম্মু পুরোপুরি সুস্থ হোক তারপর নাহয় তাকে আনতে যাবে। কি বল তুমি?" রহিম মিয়া উনার স্ত্রী রাহেলা বেগমের দিকে দৃষ্টি ফেলে শেষের কথাটা জিজ্ঞেস করলেন।
-"হ্যাঁ ঠিক বলেছ। মেয়েটার মা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া অবধি তাকে আনার দরকার নেই। থাকুক সে ওখানে আর তার মায়ের সেবাযত্ন করুক।"
দুজনের কথা শুনে তামিম শুধু মাথা নাড়ালো। সে আগে থেকেই জানত মায়ার আম্মুর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বললে তার আম্মু-আব্বু এমন কিছুই বলবে। তাই সে কোনোপ্রকার চাপ না নিয়েই তখন মায়াকে আনার কথা বলে। আর সে তখন নিশ্চিত ছিল যে তার আম্মু-আব্বু কেউই বলবে না যে মায়াকে নিয়ে আসতে। আপাতত তাদের দুজনকে একটা মিথ্যা বলে বুঝ দেওয়া গেছে। কিন্তু এইভাবে বসে থাকলে চলবে না মায়াকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাকে কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু সে কি করবে?
.
-"বাহ এখন আবার নতুন একজন জোগাড় করে ফেলেছ দেখছি! তা তোমার আগের পার্টনার তামিমকে ছেড়ে দিয়েছ নাকি?"
মায়া নিজেদের বাসায় এসেছে এটা শুনে তার একটা বান্ধবী মায়াকে দেখতে চলে আসে। এক পর্যায়ে মায়ার বান্ধবী মায়াকে বলে সে কিছু কেনাকাটার জন্য মার্কেটে যাবে। মায়ার বান্ধবী বায়না ধরে মায়াও যেন তার সাথে আসে। শেষমেষ মায়া বাধ্য হয়ে তার বান্ধবীর সাথে মার্কেটে আসে। তার বান্ধবীর কেনাকাটা শেষ হলে তারা যখন মার্কেট থেকে বেরিয়ে আসতে যাবে তখনই মায়া দেখল যে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে একসাথে মার্কেটে ঢুকছে। মেয়েটাকে মায়ার খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। পরক্ষণেই তার মনে পরল এই মেয়েটাকে তো সে ওই ভিডিওর মধ্যে দেখেছিল যে কিনা তামিমের সাথে একটা আবাসিক হোটেলে ঢুকছিল। উক্ত বিষয়টা মনে হতেই মায়া ওই মেয়েটার সামনে এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়ালো আর মেয়েটার দিকে দৃষ্টি ফেলে উপরোক্ত কথাটা বলে উঠলো।
-"সরি আপনার কথাটার মানে ঠিক বুঝলাম না। আর তামিমকে আপনি কিভাবে চিনেন? কে হোন আপনি তামিমের?"
-"তার হতভাগা স্ত্রী।" স্মিত হেসে।
-"হতভাগা বলার কারণ?" কপাল কুচকে।
-"এতকিছু করে এখন সাধু সাজছ কি করে?"
-"আপনার কোনো কথার মানেই আমি বুঝতে পারছি না। একটু বুঝিয়ে বলবেন আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?"
মায়া এবার কিছু না বলে তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে তার ফোনটা বের করে সেই ভিডিওটা প্লে করে মেয়েটার চোখের সামনে ধরলো আর বললো,
-"এটা দেখে কিছু মনে হচ্ছে? নাকি তাও হচ্ছে না?"
-"এই ভিডিওটা কে করলো? আর আপনি এই ভিডিওটা কোথায় পেলেন? কে দিয়েছে আপনাকে এই ভিডিওটা?"
-"সেটা তোমার না জানলেও চলবে। তুমি এখন তোমার রাস্তা মাপ। তা ছাড়া এইসব নিয়ে তোমার এতো চিন্তা কিসের? তুমি তো দুইদিন পর পর-ই পার্টনার বদল কর। তোমার মতো খারাপ মেয়েদের এইসব নিয়ে ভাবা মানায় না। তোমরা তো সবসময়ই..."
-"এইযে আপু অনেক বলেছেন আর নয় এবার একটু থামেন। একটা ভালো পরিবারের মেয়েকে আপনি পাবলিক প্লেসে উলটা পালটা বলে যাচ্ছেন এটা কি ঠিক হচ্ছে?"
-"ওহ আচ্ছা উনি ভালো পরিবারের মেয়ে তাইনা? তাহলে তো আপনিও ভালো পরিবারের ছেলে হবেন নিশ্চয়ই। তাইতো দুজনে এইভাবে পাবলিক প্লেসে একে অন্যের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।"
-"ওর সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। সেই হিসেবে ও আমার হবু বউ। তাহলে আমি ওর হাত ধরলে আপনার সমস্যা কোথায়?"
-"ওর মতো মেয়েকে আপনি বিয়ে করবেন! আর এই ভিডিওটা দেখে কি আপনার মনে..."
-"আপনার দেখানো ভিডিওটা তো কিছুই না। বরং আমি আপনাকে এখন যেই ভিডিওটা দেখাব সেটা দেখে আপনার নিজেরই হুস উড়ে যাবে। এক মিনিট।" কথাগুলো বলেই সেই ছেলেটা তার মোবাইল বের করে একটা ভিডিও প্লে করে মায়ার চোখের সামনে ধরলো।
মায়া প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই ভিডিওটা দেখছিল। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরেই মায়া আস্তে আস্তে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করলো। মায়া নিজের চোখকেই বিশ্বাস করাতে পারছে না সে কি দেখছে। যা দেখছে তা কি সত্যি দেখছে? ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে শুরুতে তামিম সেদিনকার মেয়েটাকে (বর্তমানে যেই মেয়েটা মায়ার সামনে অবস্থান করছে) নিয়ে একটা রুমের ভিতরে এসে ঢুকে। সেই রুমে আগে থেকেই একটা ছেলে অবস্থান করছিল আর সেই ছেলেটা এখন মায়ার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ তামিম আর ওই ছেলেটার মধ্যে কি যেন কথা হলো। তারপর তামিম মেয়েটাকে রেখেই সেখান থেকে চলে গেল। তামিম চলে যাওয়ার পর ছেলেটা ওই মেয়ের পা ধরতে চাইল কিন্তু তার আগেই মেয়েটা তাকে ধরে ফেললো। অতঃপর ছেলেটা নিজের চেহারায় অনুতপ্ততার আশ এনে মেয়েটার কাছে কি যেন বলতে লাগলো। ছেলেটার কথাগুলো বলার ইঙ্গিতে এটাই বোঝাচ্ছে যে ছেলেটা মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে।
-"ভিডিওটা দেখে হয়তো কিছুই বুঝতে পারেননি। শুনুন তাহলে আমি একটু বলি। আমাদের সম্পর্কটা দুই বছরের। সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে মীরাকে আমি ওইদিন রুমডেটের প্রস্তাব দেই আর বলি সে যদি আমার সাথে রুমডেট না করে তাহলে তার সাথে আমি আর সম্পর্ক রাখতে পারবো না। মীরাও আমার কথায় বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু রুমডেটের দিন মীরা তার সাথে তামিম নামের একটা ছেলেকে নিয়ে আসে। তিনি এসে আমায় কিছুক্ষণ বুঝানোর চেষ্টা করেন যে বিয়ের আগে এইসব করে আমি যেন মীরার জীবনটা নষ্ট না করি। এর চেয়ে ভালো আমরা দুজনে বিয়ে করে আমাদের সম্পর্কটা হালাল করে নেই। এই বিষয়ে যত হেল্প লাগবে তার সবকিছুই তিনি করবেন বলে কথা দেন। আমিও উনার কথাগুলো শুনে নিজের ভুল বুঝতে পারি আর ওইদিন মীরাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে আসি। তার পরেরদিন তামিম ভাই আমাদেরকে দুজন নিয়ে প্রথমে মীরার বাসায় যান আর তার বাসার সবাইকে আমাদের বিষয়ে জানিয়ে তাদেরকে রাজি করান আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিতেও। তারাও তামিম ভাইয়ের কথাগুলো শুনে আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেন। ঠিক একইভাবে তিনি আমাদের বাসায় গিয়েও আমার আম্মু-আব্বুকে আমাদের বিষয়টা নিয়ে কথা বলেন। উনার কথা শুনে আম্মু-আব্বুও আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেন। তারপর ওইদিন দুপুরেই আমার বাসার মানুষরা মীরাদের বাসায় গিয়ে আমাদের বিয়ের বিষয়ে কথা বলে আমাদের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করেন। এখন আপনি ভাবতে পারেন আপনাকে বুঝ দেওয়ার জন্য আমি হয়তো এই ভিডিওটা করে রেখেছিলাম। কিন্তু না এমন কিছুই না। ভেবেছিলাম মীরার সাথে রুমডেটের গেলে সেটার ভিডিও করে পরবর্তী সময়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে আরও অনেকবার তার সাথে রুমডেট করতে পারবো। তাই মীরা রুমে ঢোকার আগেই আমি মোবাইলটায় ভিডিও রেকর্ডিং চালু করে সেটা এক জায়গায় লুকিয়ে ফেলি। আশা করি সবকিছু বুঝতে পেরেছেন। আচ্ছা তাহলে এখন আমরা যাই, চল মীরা।" কথাগুলো বলেই সেই ছেলেটা মীরা নামের মেয়েটাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
তারা চলে যাওয়ার পর মায়া ওইখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সে যে তামিমকে সন্দেহ করে কত বড় ভুল করেছে সেটা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। ছেলেটা যদি এই ভিডিওটা না দেখাত তাহলে সে তামিমকে সারাজীবন ভুল ভেবেই বসে থাকত। এখন সে কি করবে? তামিমের কাছে গিয়ে কি ক্ষমা চাইবে? ক্ষমা চাইলে কি তামিম তাকে ক্ষমা করবে? করুক বা নাই করুক তার উচিৎ একবারের জন্য হলেও তামিমের কাছে গিয়ে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাওয়া।
-"কিরে এইসব কি হলো আমি তো কিছুই বুঝলাম না।" পাশ থেকে মায়ার বান্ধবী বললো কথাটা।
-"এতকিছু বুঝা লাগবে না। এখন বাসায় চল।"
তারপর তারা দুজনে মার্কেট থেকে বেরিয়ে বাসায় চলে আসলো। বাসায় এসেই মায়া নিজের রুমে গিয়ে নিজের জামা-কাপড় গোছাতে লাগলো। এমন সময় মায়ার আম্মু এসে রুমে ঢুকলেন। তাকে জামা-কাপড় গোছাতে দেখে তিনি বলে উঠলেন,
-"কিরে জামা-কাপড় গোছাচ্ছিস কেন? কোথাও যাচ্ছিস নাকি?"
-"হ্যাঁ।"
-"সেকি! কোথায় যাচ্ছিস?"
-"যেখান থেকে এসেছিলাম সেখানেই আবার ফিরে যাচ্ছি।"
-"মানে?"
-"মানে আমি আমার স্বামীর কাছে চলে যাচ্ছি। আব্বু বাসায় আসলে বলে দিও আমি চলে গেছি।" কথাগুলো বলেই মায়া নিজের লাগেজটা নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলো।
.
রাতেরবেলা বাসায় এসে ঢুকতেই তামিম কিছু মানুষের হাসাহাসি শুনতে পেল। হাসাহাসি শুনে মনে হচ্ছে বাসায় কেউ এসেছে। কিন্তু কে এসেছে সেটা তামিম বুঝতে পারছে না। এটা বোঝার জন্য তামিম ভিতরে ঢুকে দেখে ড্রয়িংরুমে তার আম্মু-আব্বু আর তাদের সাথে একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটা উলটোদিক ফিরে বসে আছ্র তাই তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে তামিমকে ড্রয়িংরুমে দেখে তার আম্মু বলে উঠলেন,
-"এতক্ষণে তোর আসার সময় হলো তাহলে? দেখ বউমাও আজ চলে এসেছে আমাদেরকে দেখতে।"
তামিমের আম্মুর কথাগুলো শেষ হতে না হতেই মায়া পিছনে ফিরে তাকায়। তামিমও মায়ার দিকে এক পলক তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হতেই মায়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। তামিম কিছু না বলে একটা মুচকি হাসি দিয়ে রুমে চলে আসলো।
.
রাতের খাওয়া শেষ করে তামিম নিজের রুমে চলে আসলো। তার কিছুক্ষণ পর মায়াও রুমে এসে ঢুকলো আর সোজা তামিমের পা জড়িয়ে ধরলো।
-"আমার ভুল হয়েগেছে প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দেন। আমি আর কখনো আপনাকে সন্দেহ করবো না। ওই ভিডিওটা দেখে আপনার উপর একটা ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গেছিল তাই আপনাকে সেদিন যা তা বলে ফেলেছিলাম। প্লিজ আমাকে সবকিছুর জন্য ক্ষমা করে দেন।" কেঁদে কেঁদে বললো কথাগুলো।
তামিম মায়াকে ধরে দাড় করালো আর তার দিকে নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-"মানুষ মাত্রই তো ভুল। সৃষ্টির প্রথম মানবও তো ভুল করেছিলেন। ভুল করে উপরওয়ালার কাছে ক্ষমা চাওয়ায় তিনি উনাকে ক্ষমা করে দেন কারণ তিনি ছিলেন উপরওয়ালার প্রিয়দের মধ্যে একজন। তুমিও ভুল করেছ আর এখন সেই ভুলের ক্ষমাও চাচ্ছ। আমিও তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম কারণ তুমি আমার প্রিয়দের মধ্যে একজন। এবার কান্না থামাও আর কেঁদ না।" কথাগুলো বলেই সে মায়ার চোখের পানি মুছে দিল।
মায়া এখনো নিরবে কেঁদেই যাচ্ছে।
-"তা নিজের ভুলটা উপলব্ধি করলে কিভাবে জানতে পারি?"
তারপর মায়া তামিমকে আজকের ঘটনাটা জানানো। সব শুনে তামিম কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তখন মায়া তামিমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-"কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
-"হ্যাঁ কর।"
মায়া কিছু না বলে তার ফোনটা হাতে নিয়ে সেই প্রথমদিনের ছবিগুলো তামিমকে দেখিয়ে বললো,
-"আপনার সাথে এই মেয়েটা কে? আর আপনি এই মেয়েটার হাত ধরে আছেন কেন?"
মায়ার কথা শুনে তামিম কিছুক্ষণ চোখ সরু করে মায়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। তামিমের তাকানো দেখে মায়া আবার বলে উঠলো,
-"আপনাকে সন্দেহ করছি না, শুধু জানতে ইচ্ছা করছে যে এই মেয়েটা কে।" মাথা নিচু করে।
-"আসলে ওই মেয়েটা আমার অফিসের কলিগ। মেয়েটা রাস্তা পার হতে অনেক ভয় পায়। সেদিন আমাকে দেখে তাকে রাস্তা পার হতে হেল্প করার জন্য অনেক রিকুয়েষ্ট করে। তা ছাড়া মেয়েটা আমাকে নিজের ভাইয়ের মতো ভাবে আর আমিও তাকে বোনের মতোই দেখি। তাই সেদিন কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাকে রাস্তা পারাপারে হেল্প করলাম। রাস্তা পারাপারের সময় সে একটু বেশিই ভয় পাচ্ছিল তাই বাধ্য হয়ে তার হাত ধরে তাড়াতাড়ি করে তাকে নিয়ে রাস্তাটা পার হই। কিন্তু এই কাজটা করতে গিয়ে আমি নিজেই ফেসে গেলাম।" একদমে কথাগুলো বলে তামিম থামলো।
-"কিন্তু ছবিতে যে একটা আবাসিক..."
-"ওটা এডিট করা হয়েছে। কারণ ওই রাস্তায় কোনো আবাসিক হোটেল নেই।"
-"আচ্ছা এইসব কিছুর পিছনে মূল ব্যক্তিটা কে?"
-"তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড লিজা।"
-"কিহহ লিজা! কিন্তু সে তো এখন বাহিরের দেশে আছে তাহলে..."
-"কয়েকমাস আগেই সে দেশে চলে এসেছে। তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে এটা শুনে সে হয়তো আর তোমাকে জানায়নি যে সে দেশে চলে এসেছে।"
-"কিন্তু লিজা এমনটা কেন করলো?"
-"ভার্সিটিতে থাকাকালীন সময়ে সে আমাকে ভালোবাসত কিন্তু তার চলাফেরা আমার কাছে একদমই ভালো লাগতো না। তাই সে অনেকবার প্রেমের প্রপোজাল দেওয়ার পরেও তাকে ফিরিয়ে দেই।"
-"ও বর্তমানে কোথায় আছে? শুধু বল আমায় তারপর দেখবা আমি ওর কি হাল করি। খুব শখ ওর আমার সংসার ভাঙার না, ওকে তো আমি..."
-"ওর প্রতি আর রাগ দেখাতে হবে না বা ওকে তোমার কিছু করাও লাগবে না। ওর কাজের শাস্তি ও ইতিমধ্যে পেয়ে গেছে।"
-"কিভাবে?"
-"ওর বাবার একটা ফ্যাক্টরি আছে যেটার সাথে অনেক বেআইনি টাকা যুক্ত করা। সেটার তথ্য পুলিশ পেয়ে গেছে। এখন বাবা-মেয়ে দুইজনকেই বেআইনি টাকা যুক্ত রাখার জন্য শাস্তি পেতে হবে, কম হলেও ৬ মাস জেল।"
-"লিজার ব্যাপারটা আপনি আমায় আগে বললেন না কেন? তাহলে তো আর এতকিছু হতো না।"
-"যদি তুমি কষ্ট পাও তাই এই বিষয়ে তোমাকে কিছু জানাইনি। তা ছাড়া মেয়েটা যে এতকিছু করে বসবে সেটাও কখনো ভাবিনি। যাইহোক এখন এইসব বাদ দাও। লিজা তো নিজের কর্মের শাস্তি পেয়ে গেল। কিন্তু তোমার কর্মের শাস্তিটা তো এখনো দেওয়া হয়নি।"
-"কি শাস্তি দিবেন আমায় দেন। আপনি যেই শাস্তি দিবেন আমি সেটা মাথা পেতে মেনে নিব।"
মায়ার কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তামিম তাকে হালকা টান দিয়ে নিজের বুকের মধ্যেই নিয়ে আসলো। আর তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো,
-"আর কখনো সত্যিটা যাচাই না করে আমায় সন্দেহ করতে পারবা না। আর সারাজীবন তোমাকে আমার বুকের মধ্যেই থাকতে হবে। এটাই হচ্ছে তোমার শাস্তি।"
-"সারাজীবন বুকের মধ্যে থাকলে রান্না-বান্না আর অন্যান্য কাজগুলো কে করবে তাহলে?"
-"উম এটাও তো কথা। আচ্ছা তাহলে শুধু ঘুমানোর সময় আমার বুকে থাকতে হবে। ওকে?"
-"আচ্ছা।"
-"আমার মায়াবতী বউটা।" কথাটা বলেই তামিম মায়ার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। মায়া কিছুটা লজ্জা পেয়ে তামিমের বুকে তার লজ্জামাখা চেহারাটা লুকিয়ে ফেললো। তামিম মায়াকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আর মনে মনে বললো, "এই নতুন অধ্যায়ের সূচনাটায় যেন আর কোনোপ্রকার অশান্তি না আসে, উপরওয়ালার কাছে এই চাওয়াটাই রইলো।"
.
.
.
.
.
The End.......
বিঃদ্রঃ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা গল্পটার সাথে ছিলেন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ এতদিন যাবত গল্পটায় সাপোর্ট দিয়ে আসার জন্য। গল্পটা এতো তাড়াতাড়ি শেষ করে দেওয়াতে এখন অনেকেই বলবেন এতো তাড়াতাড়ি শেষ করলাম কেন। শুরুতেই ভেবে রেখেছিলাম গল্পটা ৫ পর্ব অবধি করবো। কিন্তু আপনাদের সাপোর্ট পেলে এর বেশি করার চেষ্টা করবো। কিন্তু আশানুরূপ আপনাদের সাপোর্ট না পাওয়ায় গল্পটা এইখানেই শেষ করে দিলাম। তাই গল্পটা এতো তাড়াতাড়ি শেষ করলেন কেন বলে দুঃখ প্রকাশ করা লাগবে না। যাইহোক পুরো গল্পটা সবার কাছে কেমন লেগেছে অবশ্যই একটা সুন্দর গঠনমূলক কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ হাফেজ ❤️


0 Comments