-"আপনার স্বামী যে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে আপনি জানেন? আজ আপনার স্বামীকে দেখলাম একটা মেয়েকে সাথে নিয়ে আবাসিক হোটেলে ঢুকছে। আপনার স্বামী সারাদিন কি করে, কোথায় যায় তার কোনো খোঁজ-খবর রাখেন আপনি?"
সন্ধ্যার পর মায়া রুমে বসে বসে ফেসবুকে গল্প পড়ছিল। এমন সময় তার ইমুতে একটা আননোন নাম্বার থেকে উপরোক্ত মেসেজটা আসে। মেসেজটা পড়ার জন্য ইমুতে ঢুকে আননোন নাম্বার থেকে আসা মেসেজটা পড়ে মায়া কিছুটা থমকে যায় সাথে কিছুটা অবাকও হয়, আর ভাবতে থাকে এই মেসেজটা কে দিল, আর এই আননোন নাম্বারটাই বা কার? এই মেসেজটা কি তাকেই দেওয়া হয়েছে নাকি ভুলবশত তার নাম্বারে চলে এসেছে। নাম্বারটা কার এটা জানার জন্য মায়া ওই ইমু নাম্বারে একটা মেসেজ লিখে পাঠাল।
-"কে আপনি?"
উপরোক্ত মেসেজটা লিখে সেন্ট করে মায়া অধীর আগ্রহে মেসেজের রিপ্লাই পাওয়ার আশায় বসে রইলো। মায়াকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি, মূহুর্তের মধ্যেই ওই আননোন নাম্বারটা থেকে তার মেসেজের রিপ্লাই চলে আসলো।
-"আমি কে সেটা আপনার না জানলেও চলবে। আপনি আপাতত আপনার স্বামীর চলাফেরার উপর একটু লক্ষ্য রাখুন। নাহলে খুব শীগ্রই আপনাদের মধ্যে কোনো এক তৃতীয় ব্যক্তির আগমন ঘটবে। কারণ আপনার স্বামীর চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র হলেও ওই ফুলের ভিতরটা বিষাক্তময় বিষে ভরপুর রয়েছে। কয়েকটা পিক পাঠাচ্ছি সেগুলো দেখেন তাহলেই বুঝতে পারবেন আমি সত্যি বলছি না মিথ্যা বলছি।" সাথে সাথে ওই আননোন নাম্বারের ব্যক্তিটা মায়ার ইমুতে কয়েকটা পিক পাঠায়।
মায়া ওই আননোন নাম্বার থেকে আসা মেসেজটা পড়ে শেষ করতে না করতেই ওই আননোন নাম্বারের ব্যক্তিটা তাকে কিছু পিক পাঠায়। পিকগুলো ছিল মূলত মায়ার স্বামী তামিম আর একটা মেয়ের। মায়া সেই পিকগুলো দেখে পুরো স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ স্ক্রিনের ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে তামিম একটা মেয়ের পাশাপাশি হাটছে। আবার আরেকটা ছবিতে তামিম ওই অচেনা মেয়ের হাতও ধরে রেখেছে। মায়া ভালো একটু খেয়াল করে দেখে ছবিগুলো মূলত একটা আবাসিক হোটেলের কাছাকাছি তুলা ছবি। তাহলে কি তামিম সত্যিই পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে? আর এই আননোন নাম্বারের ব্যক্তিটাই বা কে। আর সে কেনই বা তাকে এইসব ছবি পাঠালো? এইখানে তো তার কোনো লাভ আছে বা হয়েছে বলে তো মনে হয়না। এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় মায়ার মাথা ধরে আসে। মায়া আর কিছু ভাবতে গেল না। কারণ কোনো বিষয়ে বেশি ভাবতে গেলে মায়ার মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যায় আর সেটা একসময় অনেক তীব্রতর হয়ে উঠে। মায়া আরও একবার ওই ছবিগুলো দেখল। ওই ছবিতে তামিম একটা নীল রঙের শার্ট পড়ে আছে। পরক্ষণেই মায়ার মনে হলো যে এই শার্ট তো কিছুদিন আগেই মায়া তামিমের জন্য কিনেছিল। আর তামিম সেটা গতকালকেই পড়েছিল। মায়া এবার ওই আননোন নাম্বারের ব্যক্তিটাকে একটা মেসেজ দিতে যাবে তখন সে দেখে ওই নাম্বার থেকে তাকে ব্লক করে দিয়েছে। তাকে কেন ওই নাম্বারের ব্যক্তিটা ব্লক করলো এটা মায়ার বুঝে আসছে না। মায়া এবার না চাইতেও এইসব বিষয় নিয়ে গভীর ভাবনায় পরে গেল। এতো ভাবার কারণে একসময় মায়ার মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যায়।
.
রাত ৯ টার দিকে তামিম বাসায় এসে বেশ দেখে পুরো বাসা অন্ধকার হয়ে আছে। মায়া তো প্রতিদিন সন্ধ্যার আগেই বাসার সব লাইট জালিয়ে ফেলে। তাহলে আজ বাসাটা অন্ধকার হয়ে আছে কেন? মায়ার কিছু হলো না তো?
এই বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তামিমের মনে একটা অজানা ভয়ের অস্তিত্ব জেগে উঠলো। তামিম আর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে না থেকে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জালিয়ে "মায়া" বলে ডাকতে ডাকতে তাদের রুমে চলে আসলো। রুমে এসে তামিম দেখল মায়া বিছানায় শুয়ে আছে। তামিম রুমের লাইটটা জালিয়ে তাড়াতাড়ি করে মায়ার কাছে চলে আসলো। আর মায়ার কাধে আলতো করে হাত দিয়ে বলতে লাগলো,
-"মায়া কি হয়েছে তোমার? এই সময়ে শুয়ে আছ যে।"
তামিমের কথায় মায়ার কোনো নড়চড় হলো না। এতে তামিমের মনের অজানা ভয়ের অস্তিত্বটা আরও বেড়ে গেল। মায়াকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে। যদিও তাদের বিয়েটা পারিবারিকভাবেই হয়েছে। কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই তামিম মায়ার মায়াবী চেহারাটা দেখে তার প্রেমে পরে যায়। তারপর একসময় সেটা ভালোবাসায় রূপ নেয়। তাই মায়ার কখনো হালকা জ্বর কাশি হলেই তামিম একদম অস্থির হয়ে পরে। তামিম অবশ্য একবার মায়াকে তার ভালোবাসার কথাটা বলেছিল। তা শুনে লজ্জায় মায়ার চেহারা একদম লাল হয়ে পরেছিল। সেদিন আর মায়া একবারের জন্যও তামিমের ধারেকাছে আসেনি। শুধু রাতেরবেলা ঘুমানোর সময় রুমে এসে চুপটি মেরে বিছানার একপাশে শুয়ে পরে।
-"মায়া কথা বলছ না কেন? তোমার কি শরীর খারাপ?" তামিম এবার মায়ার কাধ ঝাঁকিয়ে কথাটা বললো।
হঠাৎ ঘুমের মধ্যে ধাক্কা লাগাতে মায়ার ঘুম ভেঙে গেল। মায়া এবার শোয়া থেকে উঠে ঘুম ঘুম চোখে চারপাশে তাকাতে লাগলো। একপর্যায়ে তামিমের দিকে চোখ পরতেই মায়া কিছুটা চমকে উঠলো। সাথে সাথে মায়া শোয়া থেকে উঠে বসলো আর বললো,
-"আপনি কখন বাসায় আসলেন?"
-"মাত্রই আসলাম। এসে দেখি তুমি ঘুমিয়ে আছ। আজ হঠাৎ এই অসময়ে ঘুমিয়েছিলে যে। শরীর খারাপ নাকি তোমার?"
কথাগুলো বলে তামিম মায়ার কপালে হাত দিতে যাবে তার আগেই মায়া তার হাত ধরে দূরে সরিয়ে দিল। মায়ার এমন কাজে তামিম কিছুটা অবাক হলেও বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিল না। এদিকে মায়া বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বললো,
-"দরজা তো ভিতর থেকে আটকানো ছিল। আপনি বাসায় ঢুকলেন কি করে?"
-"কিছুদিন আগেই তো একটা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে আনলাম মনে নেই? অনেক্ষণ যাবত বাসার কলিংবেল বাজানোর পরেও যখন তুমি দরজা খুলছিলে না তখন সেটা দিয়েই বাহির থেকে দরজার লক খুলে ভিতরে ঢুকি।"
-"ওহ। আচ্ছা এখন কয়টা বাজে?"
-"৯ঃ১০ বেজে গেছে।" মোবাইলের স্ক্রিনে টাইম দেখে বললো।
-"আচ্ছা আপনি থাকেন আমি রান্নাঘরে গেলাম। এখনো ভাত রান্না করি নি ভাত বসাতে হবে এখন।"
-"এই অসময়ে ঘুমিয়ে থাকার কারণটা বললে না যে।"
-"একটু মাথা ব্যাথা করছিল তাই ঘুমিয়ে ছিলাম।"
-"এখন কমেছে কি?"
মায়া আস্তে করে "হুম" বলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। মায়া চলে যাওয়ার পর তামিম বসে বসে মায়ার কর্মকাণ্ডের বিষয় নিয়ে ভাবতে লাগলো। প্রতিদিন অফিস শেষে তামিম বাসায় এলেই মায়া তামিমকে এক গ্লাস পানি এনে দেয় আর কিছুক্ষণ রেস্ট নিতে বলে তার জন্য হাল্কা নাস্তা বানাতে চলে যায়। তামিম মাঝেমধ্যে মায়াকে নাস্তা বানাতে না করে তার পাশে বসিয়ে দু'জন মিলে কিছুক্ষণ গল্প করে। তারপর একসময় মায়া রাতের রান্না করতে রান্নাঘরে চলে যায়। কিন্তু আজ মায়ার কি এমন হলো যে তামিম তার কপালে হাত দিতে গেলে মায়া তার হাত সরিয়ে দিল। আবার আজকে মায়া তার জন্য কোনোপ্রকার নাস্তার আয়োজনও করলো না। মায়ার মধ্যে হঠাৎ এতো পরিবর্তন আসাতে তামিম কিছুটা ভাবনায় পরে যায়। পরক্ষণেই সে মনে মনে বললো, "হয়তো মায়ার এখনো মাথা ব্যাথা করছে তাই সে এমন আচরণ করেছে।"
.
রাতেরবেলা খাবার খেতে বসে তামিম দেখলো মায়া খাবার না খেয়ে শুধু প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করছে আর মনে মনে কি যেন ভাবছে।
-"কি হলো খাচ্ছ না কেন?"
-"মায়া চুপ করে আছে।"
-"মায়া।" মায়ার হাতে আলতো করে হাত রেখে।
হঠাৎ হাতে কারও ছোঁয়া পেয়ে মায়া হকচকিয়ে উঠলো। আর সামনে তাকিয়ে দেখলো তামিম তার দিকে তাকিয়ে আছে।
-"কিছু বলবেন?"
-"কিছু নাহ। খাবার খাচ্ছ না কেন?"
-"হুম খাচ্ছি।" বলেই মায়া তার প্লেটের খাবার খেতে শুরু করলো।
তামিমও মায়ার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আগের ন্যায় খাবার খেতে লাগলো। এদিকে মায়া খেতে খেতে মাঝেমধ্যে তামিমের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। তার তাকানোর কারণটা এটাই যে তামিম সত্যিই পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে কি না এটা বোঝার চেষ্টা করা।
.
খাওয়া দাওয়া শেষে তামিম রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে আর শুয়ে শুয়ে মায়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর মায়া রুমে এসে লাইট নিভিয়ে বিছানায় উঠে একপাশ ফিরে শুয়ে পরল। তামিমও মায়াকে নিজের কাছাকাছি আনার জন্য মায়ার পেটে আলতো করে হাত রাখল। সাথে সাথে মায়া তামিমের হাতটা সরিয়ে দেয় আর চেহারায় কিছুটা রাগ ফুটিয়ে বলে,
-"আমার ঘুম পাচ্ছে, আমায় ঘুমাতে দেন। অযথা ডিস্টার্ব করবেন না প্লিজ।"
মায়ার এমন কথায় তামিম অনেকটা চমকে উঠে। কারণ তাদের বিয়ের ৩ মাসের মধ্যে মায়া কখনো তামিমের সাথে এমন রাগী গলায় কথা বলেনি। তাহলে আজ হঠাৎ মায়ার কি হলো? মায়ার মাথা ব্যাথা থাকলে তো আমায় একবারের জন্য হলেও বলতো যে আমার মাথাটা একটু টিপে দেন। কারণ যতবারই মায়ার মাথা ব্যাথা হয় মায়া ততবারই আমায় তার মাথা টিপে দিতে বলতো। মায়ার আজকের কর্মকাণ্ডগুলো অনেক ভাবনায় ফেলে দেয় তামিমকে। হঠাৎ তামিমের সেই মানুষটার কথা মনে হলো। সে বলেছিল সে তার আর মায়ার সংসারে বিচ্ছেদ ঘটাবেই। আর সে একবার যা বলে তাই করে। তাহলে কি সেই মানুষটার কথা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে?
.
.
.
.
.
Loading.......
#আমাদের_সংসার
#লেখকঃ- Tamim
#পর্বঃ- ১
হ্যাপি রিডিং ❤
~~সবাই নিয়মিত নামাজ পড়বেন আর নামাজের লাভ জানিয়ে অন্যদেরকে দাওয়াত দিবেন~~


0 Comments