মুনতাছির হাসান তামিম
"এই যে শুনেন, আজকের এই দিনে আমি যদি আপনার জন্য গুনে গুনে সতেরোটা ইরানের নবযৌবন প্রাপ্ত তরতাজা সাদা গোলাপ লাল সুঁতো দিয়ে বেঁধে অগনিত মানুষের সামনে হাঁটুগেড়ে ছোট্ট করে আপনাকে বলি , আমি আপনাকে খুব করে ভালোবাসি তখন আপনি কি আমায় করুণার ছলে মেনে নিবেন, মায়াবীনি " -- আজ ৮ই ফ্রেব্রুয়ারি, আজ সবার বলা অনুযায়ী প্রপোজ ডে, সবে মাত্র এসএসসি পাস করে ইন্টারে পা দিলাম, কলেজে যেদিন প্রথম ক্লাস করতে এসেছিলাম সেদিন থেকেই একটা মেয়ের মায়ায় আটকে যায়, সারাদিন সারারাত শুধু তারই ভাবনা মনের গহীনে, মেয়েটার নাম বর্ষা, সে কিন্ত খুব সুন্দরী এমন কিন্তু নাহ, তবে তার মুখের কোণে মুসকি হাসিতে তাকে দেখতে আরো বেশী সুন্দরী করে ফেলে যা হয়তো তার অজানা৷ কলেজের প্রথম দিন যখন সিড়ি বেয়ে ক্লাসের দিকে যেতে লাগলাম তখন তার সাথে ধাক্কা লেগে যায় আমার, সে বিরক্তিকর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কিছু নাহ বলে চলে যায়। কিন্তু আমার জানা ছিলো নাহ, তার এই বিরক্তিকর চাহনিটাই আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিবে। প্রতিনিয়ত শুধু মায়াময় চোখের চাহনিটাই চোখে ভাসে,জানি নাহ এটা ভালোবাসা নাকি ভালোলাগা, আসলেই ভালোবাসা আর ভালোলাগা বেশ অদ্ভুত জটিল বিষয়। নচিকেতার একটা গানের জনপ্রিয় লাইন, ‘ভালোবাসা আসলেতো পিটুইটারির খেলা, আমরা বোকারা বলি প্রেম’। বলা হয়ে থাকে, রোমান্টিক অনুভূতি আসলে রসায়ন ও মনোস্তত্ত্বের এক জটিল মিথষ্ক্রিয়া। ধরুন, হঠাৎ আপনি একেবারে উথালপাথাল প্রেমে পড়ে গেলেন। আর আপনার এক বেরসিক বন্ধু বললো, আরে, এসব ভালোবাসা টালোবাসা বলে কিছুই নাই। এসব অনুভূতি মূলত ফেরোমোন, ডোপামিন আর অক্সিটোসিনের একটা ককটেল। দেখবি কয়েক বছর পর সব উবে যাবে! প্রথম প্রেমে পড়া যে কাউকে এমন কথা বললে নিঃসন্দেহে হতচকিয়ে যাবে, হঠাৎ জীবনটাকে অর্থহীন বেকার মনে হবে। প্রশ্ন হলো, প্রেম ভালোবাসা কি আসলেই মস্তিষ্কে রাসায়নিকের খেলা? আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে! এরকম আগপিছু না ভেবেই প্রেমে পড়ে মানুষ। কখনো কখনো প্রথম দেখাতেই পা পিছলে পড়ে! ফলে ভেবেচিন্তে দেখেশুনে প্রেম খুব কমই হয়। অতোটা সচেতন হলে প্রেমে পড়াও যায় না। এমনটাই বলেন কবিরা।
এ কারণে ‘ভালোবাসা অন্ধ’ এমন কথা বলে মানুষ। ভালোবাসাকে যুক্তির সীমায় বাঁধা যায় না। রোমান্টিক প্রেম বলতে যা বুঝায় সেটির কোনো সীমা নেই, অপ্রতিরোধ্য, বিস্ফোরক! এ প্রেমে যখন কেউ পড়ে সে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তবে এখানে রহস্যের ব্যাপার হলো, এ প্রেমে একটা সরলতা আছে- কেউ যখন এমন প্রেমে জড়িয়ে যায় তখন তার আচরণ ও পরিণতি অনেকখানি অনুমেয় ও অবশ্যম্ভাবি। নানা যুগে ও স্থানে নানা সংস্কৃতিতে এ প্রেমের প্রকাশটা প্রায় একই রকম। আধুনিক বিজ্ঞানের আগে এ ধরনের আবেগ অনুভূতিকে মানুষ সাধারণ কিছু কার্যকারণের সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেছে। যেমন, কিউপিডের তীর, তান্ত্রিকের বাণ ইত্যাদি। এভাবে আরেক রহস্যময় প্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে প্রেমকে জুড়ে দেয়ার একটা প্রবণতা ছিল।
অবশ্য শুধু বিজ্ঞান দিয়ে প্রেম ভালোবাসাকে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা আজও কঠিন। সেক্স ফেরোমন নামক রাসায়নিকটি প্রজনন সক্ষমতার বার্তা বহন করে। এটিকে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গীকে আকর্ষণের প্রধান উপাদান বলে অনেকে মনে করেন। ধারণাটি বেশ আকর্ষণীয়। তবে ফেরোমন যখন পোকামাকড়ের প্রজননের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তখন মানুষের ক্ষেত্রে এর উল্লেখ্যযোগ্য অবদানের প্রমাণ আজ অবধি পাওয়া যায়নি। এখন একটি রাসায়নিক যদি শরীরের বাইরে দূরে কোথাও সংকেত পাঠাতে পারে, তাহলে ভেতরে কেন পারে না? নিউরোপেপটাইড অক্সিটোসিন হরমোনকে অনেক সময় ভুলভাবে ভালোবাসার বন্ধনের জন্য দায়ী হরমোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রোমানন্টিক প্রেমে পড়া মানুষের মস্তিষ্কের মানচিত্র নিতে গিয়ে দেখা যায়, মস্তিষ্কের যে এলাকাটি পুরস্কার বা স্বীকৃতি চায় এবং একটি লক্ষ্যের অনুসন্ধানে থাকে সেই অংশটিই উজ্জ্বল দেখায়। ফলে ওই অংশটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠার মানে যে নির্দিষ্ট একটি উত্তেজনার কারণেই এমনটা ঘটছে এটা বলা যায় না। তাছাড়া রোমান্টিক প্রেমের কারণে ওই অংশের পরিবর্তন ও আচরণ মাতৃস্নেহ এমনকি প্রিয় ফুটবল দলের প্রতি ভালোবাসার প্রতিক্রিয়া থেকে আলাদা নয়। ফলে বলাই যায়, স্নায়ুবিজ্ঞান এই অন্ধ প্রেমের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারছে না। বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা প্রেমকে খুবই সাধারণ যান্ত্রিক বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রাণীর প্রজনন সিদ্ধান্ত একেবারে সাধারণ বা অভিন্ন নয়। ফলে একটি মাত্র বা একই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এটি ঘটে না। যেমন, লম্বা মানুষ সবদেশেই পছন্দনীয়। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, লম্বা মানুষের প্রজনন সক্ষমতা বেশি। এমনটি হলে কিন্তু আজ আমরা সবাই লম্বা হয়ে যেতাম। আর এভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেলেও এতোদিনে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এটি সম্ভব করে ফেলতো।
ব্যাখ্যার এ ব্যর্থতাই বলে দিচ্ছে রোমান্টিক আকর্ষণ অবশ্যই একটা জটিল ব্যাপার। কিন্তু এটি এ ব্যাখ্যা দিতে পারে না যে কেন এটি এতোটা প্রবৃত্তিগত এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এটি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আমরা সুচিন্তিত একটা ভাব নিই- সেরকম নয়। শান্তভাবে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া কি ভালো নয়? কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে এটি ঘটে না। কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমাদের প্রবৃত্তিকে সামলিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন থেকে শান্তভাবে ভাবতে হয় এবং বুঝেশুনে স্বাধীনভাবে সেটি প্রয়োগ করতে হয়। এসময় আশেপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়াও মাথায় রাখতে হয়। কিন্তু প্রেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে মানুষে অতোশতো ভাবে না। এ সিদ্ধান্তের জন্য কোনো ভিত্তি লাগে না। একইভাবে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়া এবং সামষ্টিক যুক্তিবুদ্ধির বিবর্তনীয় ধারণাও এর ব্যাখ্যা করার এক্ষেত্রে খুব দুর্বল।
এখানে প্রবৃত্তিকে সরলীকরণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সুচিন্তার চেয়ে ছোট করে ভাবাটা একটা ভুল। কারণ এর অন্তর্নিহিত শক্তি মানুষের যৌক্তিক বিশ্লেষণের চাইতেও বিশুদ্ধ, সচেতনভাবে যা কিছু করি বা ভাবি তার চেয়েও বিস্তৃত ও গভীর ভূমিকা রাখে এই প্রবৃত্তি। এ সত্যটি আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ধরুন একটি মুখের বিস্তারিত বর্ণনার চেয়ে আমরা চোখে দেখে বেশি ভালো করে চিনতে পারি। প্রেমের স্নায়োবিক ক্রিয়াকলাপ যদি এতোটাই সরল হতো, তাহলে সবকিছু ঠিকঠাক রেখেই একটি ইনজেকশন দিয়েই প্রেমের তীব্রতা উঠানো নামানো যেত। কিন্তু শান্ত ও কঠোর নিয়ম মেনে চলা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান এটি অসম্ভব করে তুলেছে। প্রেম এতোটা জটিল না হলে হয়তো মানুষও আজকের হোমো সেপিয়েন্স হয়ে উঠতে পারতো না!
এক কথায় বললে, প্রেম- আমাদের অন্য অনেক ভাবনা, আবেগ ও আচরণ- মস্তিষ্কের ভেতরে অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ যেভাবে প্রক্রিয়াকরণ হয় সে মতোই পরস্পরের মধ্যে একটি জটিল আন্তঃক্রিয়া। তবে প্রেম শুধু মস্তিষ্কে রসায়নের খেলা এমনটা বলা আর ‘রোমিও ও জুলিয়েট’, ‘লাইলি ও মজনু’, ‘শিরি ও ফরহাদ’ ‘বেহুলা ও লক্ষিন্দর’ এগুলো ‘শুধুই শব্দ’ এমনটা ভাবা একই কথা। এভাবে ভাবলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়। শিল্পের মতো ভালোবাসা বা প্রেম হলো শারীরবৃত্তীয় নানা ক্রিয়া ও মিথষ্ক্রিয়ার বাইরে আরো অন্য কিছু। তাহলে আমার কাছেও সহজ কেন হবে? জটিল বিষয় তো বটেই।
.
" আচ্ছা আপনার হাতে যে সাদা গোলাপ গুলো দেখছি এগুলো কি ইরানের?"
অনেক কষ্টে খোঁজে খোজেঁ সতেরোটা সাদা গোলাপ জোগাড় করেই বর্ষার সামনে গেলাম, সবাই তো লাল গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করে তাই আমি ভাবলাম সাদা গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করি,
" নাহ এগুলো বাংলাদেশেরই, অনেক কষ্টে খোঁজে খোঁজে এই আটারোটা ফুল জোগাড় করছি, এখন প্রশ্ন হতে পারে সতেরোটা ফুল কেনো? আসলে আপনার সতেরোতম জন্মদিন গেলো, সে অনুযায়ী আপনাকে সতেরোটা গোলাপ দিলাম, আপনি কি.."
আমাকে অবাক করে দিয়ে বর্ষা ফুলগুলো তার হাতে নিয়ে নিলো, আর মুসকি হাসলো, আমি শুধু মুগ্ধ নয়নে তার হাসির দিকেই তাকিযে থাকলাম। বারবার আমি তার হাসিতেই আটকে পড়ি, সে কি জানে তার এ হাসি আমাকে ঘায়েল করে? আমার খুব করে বলতে ইচ্ছে করে, " এই বর্ষাপাখি তুমি এভাবে হাসিও নাহ, তোমার এ হাসি যেনো আমাকে প্রতিনিয়ত তোমার আটকে রাখে।
" আমি চাই কেউ আমার হাসিতেই সবসময় আটকে থাকে, আমি তো সেইরকম একজনকে চাই যে সবমসময় আমাতে আসক্ত থাকবে, আচ্ছা আপনি কি সারাজীবন আমার হয়ে থেকে যাবেন? "
" আমি সারাজীবন তোমার এই মুগ্ধ হাসিতেই আসক্ত হয়ে থাকতে চাই"
বর্ষা তার হাতা বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে, আমি তার হাত ধরে উঠে দাড়ালাম। দাড়িয়ে বর্ষার দিকে তাকিয়ে দেখি বর্ষা ফুল গুলো হাতে নিয়ে খুব খুশী, ফুল গুলো দেখছে আর আমার হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। আমিও তার হাতটা আগলে রেখে সামনের দিকে হাটতে লাগলাম আর সমানে তার মুখে লেগে থাকা হাসিটার দিকে তাকিয়ে আছি, তার এই হাসিটাই আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে, সারাদিনের সব ক্লান্তি যেনো নিমিষেই তাই হাসিতে বিলিন হয়ে যায়।
দু'জনে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে হাটতে লাগলাম। হঠাৎ বর্ষা আমার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললো, " ভালোবাসি আপনাকে অনেক"।
-------------(সমাপ্ত)------------
<১৫৪>
( বিঃদ্রঃ প্রপোজ ডে উপলক্ষ্যে এই গল্পটা লিখা, পুরোটাই কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই।)


0 Comments